Home / ইসলাম / স্বামীর নাম ধরে ডাকা ও স্বামীর নামে নামকরণ করা যাবে কিনা? জেনে নিন!

স্বামীর নাম ধরে ডাকা ও স্বামীর নামে নামকরণ করা যাবে কিনা? জেনে নিন!

অনেক স্বামী- স্ত্রী নিজেদের মাঝে অনেক ফ্রি। তাই একে অপরকে নাম ধরে ডাকাডাকি করে থাকে। তো আমার জানার বিষয় হচ্ছে এই ভাবে একে অপরকে নাম ধরে ডাকাডাকি করার বিষয়ে ইসলাম কী বলে?

স্বামীর নাম ধরে ডাকা যাবে কি?
স্বামী স্ত্রীকে নাম ধরে ডাকতে পারবে এতো কোন অসুবিধা নেই। কিন্তু স্ত্রীর স্বামীর নাম ধরে ডাকা ইসলামের দৃষ্টিতে এক প্রকার অসৌজন্যতা, তাই এমনটা করা মাকরূহ বা অনুচিত। [রহীমিয়া ২-৪১৩]

স্ত্রীর নিকট স্বামী হ’লেন সবচেয়ে সম্মানের পাত্র। অতএব যেভাবে ডাকলে স্বামী খুশি হবেন সেভাবে ডাকা উচিৎ। তবে স্বামী অসন্তুষ্ট না হলে স্ত্রী স্বামীর নাম ধরে ডাকতে পারে। যেমন যয়নব রাসূল (সাঃ)- এর সামনে তার স্বামী আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাঃ)-এর নাম ধরে কথা বলেছিলেন (বুখারী হা/১৪৬২)।

ইসলামের দৃষ্টিতে স্বামীর নামে নামকরণ করা যাবে কি?

মুসলিম নারীদের অনেকেই বিয়ের পর নিজের নাম পরিবর্তন করে স্বামীর নামকে নিজের নামের অংশ বানিয়ে ফেলে। হাল জামানায় এটি একটি ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। যেমন: একজন মেয়ের বাবার দেয়া নাম ফাতেমা। রফিক নামে একজনের সাথে তার বিয়ের পর তার নাম হয়ে যায় মিসেস রফিক বা ফাতেমা রফিক। ইসলামী শরী‘আর দৃষ্টিতে এটা ঠিক নয়। মুসলিম নারীদের উচিত বিয়ের পরও তার পৈতৃক নাম ঠিক রাখা। কারণ এটা তার একেবারেই নিজস্ব, এখানে স্বামীর কোন শেয়ার নেই। নামই তার বংশ পরিচয় বহন করে।

আমরা বিদেশি সংস্কৃতি বিশেষ করে পশ্চিমাবিশ্বকে অনুসরণ করতে গিয়ে এমন অনেক বিষয় অনুকরণ করছি যেগুলোর বিষয়ে ইসলামী শরী‘আর কোন ভিত্তি নেই। বরং সেগুলো একান্তই তাদের চর্চিত বিষয়। আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির ভিত্তি হলো পবিত্র কুর’আন এবং সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) -এর বাণী, কর্ম ও অনুমোদন। অনুরূপভাবে সাহাবী (রাঃ) ও তাবেয়ীদের কথা, কাজ ও মৌনসম্মতি যাকে শরী‘আর পরিভাষায় ‘সুন্নাহ’ বলা হয়। ইসলামী শরী‘আর এ দুটি অন্যতম প্রধান উেসর কোথাও এর অনুমোদন বা সমর্থন পাওয়া যায় না।

মহানবী (সাঃ) বা সাহাবীগণের (রা) জীবনাচারেও এর কোন নজির নেই। যদি স্বামীর নামে পরিচিত হওয়া বা স্বামীর নাম নিজের নামের সাথে যুক্ত করা আভিজাত্য বা মর্যাদার ব্যাপার হতো, তাহলে আমাদের প্রিয়নবী (সাঃ) -এর স্ত্রীগণ বা উম্মাহাতুল মু’মিনীনগণও তাঁদের নামের সাথে হযরত (স) এর নাম যুক্ত করতেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো তাঁদের কেউই তা করেননি। বরং প্রত্যেকে নিজেদের পিতার নামেই পরিচিত ছিলেন যদিও তাঁদের কারো কারো কারো পিতা কাফির ছিল।

সুতরাং আমরা আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে এমন কোন বিষয় অবলম্বন করতে পারি না যার অনুমোদন উত্তম যুগে ছিল না। হযরত ‘আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ) বিয়ের পর তাঁর নাম পরিবর্তন করে ‘আয়েশা মুহাম্মদ’ রাখেননি। বরং তিনি তাঁর পিতা আবুবকর সিদ্দীকের (রাঃ) পরিচয় অক্ষুণ্ন রেখেছেন।

বাবা কর্তৃক প্রদত্ত নাম ঠিক রাখার জন্য মহান আল্লাহ তা‘আলা আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন। কারণ ঐ নামটি ব্যক্তির বংশের পরিচায়ক। কুরআন বলছে: ‘তোমরা তাদেরকে তাদের বাবার নামে ডাক।’ (আল-কুরআন, ৩৩:৫) এই আয়াতটি পালকপুত্রদেরকে তাদের প্রকৃত পিতার নামে ডাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

কেননা যারা বর্তমানে তাদের লালন-পালন করছেন বা ভরণ-পোষণ যোগান দিচ্ছেন, প্রকৃতপক্ষে তারা তাদের পিতা নন। বরং যারা তাদেরকে জন্ম দিয়েছেন তারাই তাদের আসল পিতা। অনুরূপভাবে মেয়েরাও তাদের পিতার পরিচয়ে পরিচিত হবেন স্বামীর পরিচয়ে নন। এখানে পালক পুত্রকে প্রকৃত পিতার নামে ডাকার নির্দেশ প্রমাণ করে যে, স্ত্রীদেরকেও তাদের পিতার নামে ডাকতে হবে।

হযরত সাঈদ ইবনে যুবায়ের হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)কে বলতে শুনেছেন যে, রসূল (স) বলেছেন: ‘যে কেউ নিজেকে বাবার নাম ছাড়া অন্য নামে ডাকবে তার উপর আল্লাহ, ফিরিশতা ও সমগ্র মানুষের লা‘নত বর্ষিত হবে।’ (মুসনাদে আহমাদ) ইমাম বুখারীও (রাঃ) এই হাদীসটি হযরত সা‘দ (রাঃ) সূত্রে বর্ণনা করেছেন।

হযরত সা‘দ ও হযরত আবু বাকরা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তাঁরা প্রত্যেকে বলেছেন: আমার দু’ কান শুনেছে এবং আমার অন্তর মুহাম্মদ (স) এর এ কথা সংরক্ষণ করেছে যে, মহানবী (স) বলেছেন: ‘যে ব্যক্তি জেনেশুনে নিজেকে নিজের পিতা ছাড়া অন্যের সাথে সংযুক্ত করে তার জন্য জান্নাত হারাম হয়ে যাবে।’ (ইবনে মাজাহ)

আবার হযরত আব্দুল্লাহ ইবন আমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি (সাঃ) বলেছেন: যে কেউ নিজের বাবা ব্যতীত অন্যের পরিচয়ে পরিচয় দেয় সে জান্নাতের গন্ধও পাবে না, যদিও জান্নাতের সুঘ্রাণ সত্তর বছর হাঁটার রাস্তার দূরত্ব থেকেও পাওয়া যাবে। (মুসনাদে আহমাদ)

এমন অনেক হাদীস রয়েছে যেখানে মহানবী (সাঃ) নারীদেরকে তাদের পিতার নামে ডেকেছেন। যখন পবিত্র কুরআনের আয়াত ‘আপনি আপনার নিকটতম আত্মীয়দের সতর্ক করে দিন’ (আল-কুরআন, ২৬:২১৪) নাজিল হয়, তখন মহানবী (সাঃ) তাঁর আত্মীয়দের প্রত্যেককে ডেকে ডেকে বলেছিলেন: হে অমুকের ছেলে অমুক! আমি পরকালে তোমার কোন উপকার করতে পারব না । হে অমুকের মেয়ে অমুক! আমি কিয়ামতের দিন তোমার কোন কাজে আসব না। (আল-কাশফুল মুবদি) কিয়ামতের মাঠেও প্রত্যেককে তার বাবার নাম ধরে ডাকা হবে। হাদীসের কিতাবসমূহে এ সংক্রান্ত অনেক হাদীস রয়েছে।

দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমর (রাঃ)-এর শাসনামলের একটি বিখ্যাত ঘটনা হাদীসের বর্ণনায় এসেছে। তা হলো তিনি একরাতে যখন প্রজাদের খোঁজ-খবর নেয়ার জন্য বের হলেন তখন একজন মহিলার বাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন যিনি স্বামীর বিরহে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছিলেন। তিনি পরদিন সকালে মহিলাটির খোঁজ-খবর নেয়ার জন্য লোক পাঠালেন। তাঁকে বলা হলো এ মহিলা হলেন অমুকের মেয়ে অমুক। তাঁর স্বামী আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে রয়েছেন। (সুনানে সাঈদ ইবনে মানসুর) এখানে প্রণিধানযোগ্য বিষয় হলো মহিলাটি বিবাহিত ছিলেন। তাঁর পরিচয়ের ক্ষেত্রে বলা হলো অমুকের মেয়ে অমুক। একথা বলা হলো না যে, অমুকের স্ত্রী অমুক।

আরো যে সকল কারণে নারীদের বাবার নামে পরিচিত হওয়া উচিত তা হলো: ১. স্বামী ও স্ত্রীর মাঝে কোন রক্ত সম্পর্ক থাকে না কিন্তু বাবা-মেয়ের রক্ত সম্পর্ক চিরদিনের। ২. স্বামী-স্ত্রী একে অপরের সাথে মনোমালিন্য হলে তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটতে পারে তখন এই নাম থাকে না। ৩. স্বামী মারা গেলে স্ত্রী অন্য পুরুষকে বিয়ে করতে পারে, তখন এই নামের কী দশা হবে তা সহজেই অনুমেয়। ৪. স্বামী তো বিয়ের পর নিজের নাম পরিবর্তন করে না, তাহলে নারী কেন করবে? এটা কি নারী অধিকারের লংঘন নয়?

আলোচ্য প্রবন্ধে নতুন একটি বিষয়কে অত্যন্ত ক্ষুদ্র পরিসরে আলোচনা করা হলো। মুসলিম সমাজের উচিত ইসলামকে পুরোপুরি অনুসরণ করা। আর যারা পরিপূর্ণ ইসলাম মানতে চান তাদের উচিত এসব বিষয়ে সজাগ ও সতর্ক থাকা। যাতে করে কোন অজুহাতেই আমরা সত্য ও সঠিক পথ ‘সিরাতুল মুস্তাকীম’ থেকে বিচ্যুত না হই।

লেখক : অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *