Home / অন্যান্য / আমি আর পারছি না খুব ব্যথা করছে সোনা আর একটু সহ্য করো….

আমি আর পারছি না খুব ব্যথা করছে সোনা আর একটু সহ্য করো….

আমি আর পারছি না, খুব ব্যথা হচ্ছে। মা আর একটু কষ্ট কর, তোর ভাই টাকা নিয়ে আসলেই তোকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবো। ভাইয়া কখন যে গেলো এখনও আসছে না কেন? আসবে মা, একটু কষ্ট কর। বাবা তো তোর কাছেই আছি। কথা না বলে আল্লাহকে ডাক মা। বাবা সত্যি আর পারছি না! মনে হয় মরেই যাবো! কি বলিস এসব, কিছুই হবে না তোর। আমার জীবন থাকতে তোর কিছু হতে দিবো না। তোর মাকে হারিয়েছি একমাত্র টাকার অভাবে। সেই টাকার অভাবে তোকে হারাতে পারবো না। বাবা আমরা এতো গরীব কেন? আল্লাহ আমাদের গরীব রাখতে পছন্দ করেছেন তাই হয়তো।

মুনত্বাহার এমন আর্তনাদ দেখে তার বাবার চোখে জল চলে আসে। দুই ফোটা জল পাঞ্জাবীর পকেট বরাবর গড়িয়ে পরে। খুব দ্রুত চোখের জল মুৃছে একটা ফেইক হাসি দিয়ে মেয়েটার মাথায় হাত দিয়ে বলতে থাকে, “মা তোর কিছুই হবে না চিন্তা করিস না।”

কিছুক্ষণ পর মুনত্বাহার বড় ভাই মিয়াদ আসে। কিরে তোর এতো সময় লাগলো কেন? (বাবা) বাবা মনু চাচার কাছে গেলাম, কিন্তু মনু চাচা নাকি চিটাগাং গেছে।(মিয়াদ) কি বলিস, এই ঢাকার শহরে এখন কে আমাদের টাকা দিবে? দেশী একটা মানুষ ছিল সেও চিটাগাং চলে গেলো। বাবা আমার একটা পরিচিত মানুষ থেকে কিছু টাকা ধার এনেছি। তিনি বলছেন লাগলে আরও টাকা দিবে। কে এই লোক কে, যে তোকে টাকা দিয়েছে? বাবা এসব পরে বলবো, আগে মুনত্বাহাকে নিয়ে হাসপাতাল নিয়ে যাই।

মুনত্বাহা এখন হাসপাতালে…
প্রসব যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে অনেক শব্দ করেই কান্না করে মুনত্বাহা। হাসপাতালের সবাই তার কান্নার শব্দ শুনে এগিয়ে আসে। বাট মুনত্বাহার শরীরের দিকে তাকিয়ে সবাই বুঝে মুনত্বাহা প্রেগন্যান্ট এবং সে প্রসব যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে চিৎকার করে কান্না করছে।

হ্যাঁ মুনত্বাহার কিউট একটা ছেলে হয়েছে। একদম বাচ্চাটার বাবার মত দেখতে! সিজার এবং ঔষধ সবকিছু মিলে মোট ১৬ হাজার টাকা খরচ হয়। টাকাগুলো মিয়াদ খুশি মনেই দেয়। কিন্তু মিয়াদকে একটু দুর্বল মনে হচ্ছে।

কিরে ভাইয়া তোকে এমন দুর্বল মনে হচ্ছে কেন? শ্বাসকষ্ট কি বেড়েছে নাকি? ইনহেলার সাথে আনিস নাই?(মুনত্বাহা) হ্যাঁরে, আজ একটু শ্বাসকষ্ট বেড়েছে। আর ইনহেলারটাও সাথে নেই। তুই চিন্তা করিস না, আমি ঠিক আছি। (মিয়াদ) ভাইয়া তুই মিথ্যে বলিস কেন, কি হয়েছে তোর বলবি তো? নারে কিছুই হয় নাই, একটু শ্বাসকষ্ট বেড়েছে।

মুনত্বাহা নবজাতক শিশুর বাবার নামের সাথে মিল রেখে শিশুর নাম রাখে আরিয়ান। বাবার নাম ছিল আসিফ। মুনত্বাহার বিয়ের ছয় মাস পর আরিয়ানের বাবার মানসিক সমস্যা দেখা দেয়। খুব যত্ন সহকারে তার সেবা শুশ্রূষা করা হলেও কোনো ভালো লক্ষণ দেখা যায় নি। প্রায় তিনি বাসা থেকে বের হয়ে যেতো, নিজের মাথার চুল ছিড়ে ছিড়ে মুঠো করে মুখে পুরতো। আর শুধু দেয়ালে লেখালেখি করতেন। প্রত্যেকটা লেখার শেষে নিজের নামটা খুব সুন্দর করেই লিখতেন। মাঝেমাঝে তিনি একদম সুস্থ, স্বাভাবিক মানুষের মতই ছিলেন।

বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান আসিফ। তার বাবার বিশাল ব্যবসায় বাণিজ্য। আসিফ সাহেব, তার নিজের বাবা-মা কে না জানিয়ে বিয়ে করেছিল মুনত্বাহাকে। কিন্তু কখনও বাবা-মা কে বিয়ের কথা বলা হয়নি। কারণ তিনি জানতেন তার বাবা-মা কখনও এই বিয়ে মেনে নিবে না। সত্য কয়দিন লুকিয়ে রাখা যায়। একসময় আসিফ সাহেবের বাবা বিয়ে সম্পর্কে জেনে যায়। তখন তিনি সাথে সাথে আসিফ সাহেবকে ত্যাজ্য করে দেয়।

বাবার এরূপ আচরণ সহ্য করতে না পেরেই মানসিক সমস্যা দেখা দেয়। একদিন কাক ডাকা ভোরে তিনি বাসা থেকে বের হয়ে যায়, সেই যে গেলো আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি। আজ পর্যন্ত অনেক খোঁজাখুঁজি করেও বিন্দু মাত্র খোঁজ মেলেনি তার।
আরিয়ানের বাবা এখন কোথায় আছে তা কেউ জানে না। বেঁচে আছে নাকি মরে গেছে তাও জানা নেই।

হাসপাতাল hospital থেকে মুনত্বাহা এবং তার নবজাতক শিশু আরিয়ানকে আজ বাসায় নেওয়া হয়। মুনত্বাহার বাবা আজ অনেক খুশি। কিন্তু মিয়াদ যেন একটু ব্যতিক্রম। সারাদিন শুয়ে থাকে, কারও সাথে দেখা করে না। আরিয়ানকে কোলে নেয় না। কেমন অদ্ভুত হয়ে গেছে। যে মিয়াদ সারাদিন মুনত্বাহার সাথে দুষ্টুমি করতো আজ সে তার পাশে যায় না। মুনত্বাহার বাবা জিনিসটা লক্ষ না করলেও মুনত্বাহা ঠিকই লক্ষ করে।

পরদিন দুপুরবেলা মিয়াদ ঘুমিয়ে, মুনত্বাহা মিয়াদের রুমে যায় এবং মিয়াদের শরীরের থেকে সরে যাওয়া কম্বলটা তার শরীরে টেনে দিতে চাইল। কিন্তু ঐ মূহুর্ত মুনত্বাহার নজর পরে একটা ব্যান্ডেজ এর উপর। সাথে সাথে বাবাকে ডাক দেয় মুনত্বাহা। বাবা ভাইয়ার এখানে ব্যান্ডেজ কেন দেখতো! কি বলিস কি হয়েছে মিয়াদের? এই যে দেখো কি হয়েছে? ব্যান্ডেজ! ব্যান্ডেজ কেন? এই মিয়াদ কি হয়েছে তোর? কোথায়, কি হবে?(মিয়াদ) তোর এখানে ব্যান্ডেজ কেন? আরে সামান্যা ব্যথা পেয়েছি। ঠিক হয়ে যাবে তোমরা যাও। তুই কি কিডনি বিক্রি করেছিস? হ্যাঁ বাবা তাই মনে হচ্ছে। ভাইয়া কিডনি বিক্রি করছে। আমাকে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য কিডনি বিক্রি করেছে। ভাইয়া তুই এটা কি করলি! (মুনত্বাহা কান্না করতে করতেই কথাগুলো বললো)

বাবা কি করবো বল? এই ঢাকার শহরে কে আছে আমাদের যে টাকা দিবে? কেউ নেই। তুমি জানো টাকার জন্য মাকে হাসপাতালে নিয়েও চিকিৎসা করাতে পারিনি। যার ফলে আমরা মাকে হারিয়েছি। এখন টাকার taka জন্য বোনটাকে হাসপাতালে না নিতে পারলে ওর যদি কিছু হয়ে যেতো তাহলে আমরা বেঁচে থেকে আর লাভ কি? তাই বাধ্য হয়ে কিডনি বিক্রি করে বোনটাকে হাসপাতালে নিয়ে যাই। কিডনি বিক্রি করেছি কিন্তু মরে তো আর যাবো না। যতদিন বাঁচি টিউশন করে টাকা কামাবো আর বোনের হাসিটা দেখে জীবন কাটাবো।

অতঃপর মুনত্বাহা মিয়াদকে জড়িয়ে ধরে কান্না শুরু করে দেয়। মিয়াদের বাবা father তার দুই সন্তানের এমন ভালোবসা দেখে নিজেও কান্না করে দেয়। ভালোবাসাগুলো খুব অদ্ভুত! একটু বেশিই অদ্ভুত! বোনের জন্য এরূপ ভালোবাসা, ত্যাগ তিতিক্ষা থেকেই আমরা শিক্ষা নিতে পারি যে ভাই বোনের ভালোবাসা কেমন হওয়া উচিৎ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *